যেভাবে শুরু করেছিলাম ফ্রিল্যান্সিং ও আমার আজকের অবস্থান

ফ্রিল্যান্সিংআসসালামুআলাইকুম, আজ আমি আমার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার নিয়ে লিখছি। যারা নতুন ফ্রিল্যান্সিং এ আসতে চান বা ফ্রিল্যান্সিং করতে চান তাদের জন্য এটা অনেক কাজে লাগতে পারে।

পড়াশুনাকালীন সময় থেকেই একটা আকঙ্খা ছিল স্বাবলম্বী হওয়া। সেজন্য ষ্টুডেন্ট লাইফ থেকে শুরু করেছিলাম কম্পিউটার হার্ডওয়্যার সার্ভিসিং এর কাজ। নিজে নিজেই শিখেছি, কাজ করেছি, ষ্টুডেন্ট থাকা অবস্থায় কিছু আয়-রোজগারও করেছি। কিন্তু তা থেকে কখনোই ভাল আয়ের পথ তৈরী করা সম্ভব হয়নি। হার্ডওয়্যার সার্ভিসিং এর কাজ করে সেটা আসলে সম্ভবও নয়। অনেকেই হয়ত কম্পিউটারের দোকান দিয়ে হার্ডওয়্যার সার্ভিসিং এর কাজ করে, কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানে হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করে মোটামুটি আয় করেন, তবে তা নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাই না।

যেহেতু আমার পড়াশুনার বিষয় ছিল কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। তাই সব সময় টার্গেট ছিল আইটি বেইজ কিছু করার। টার্গেট ছিল স্বনির্ভর হওয়া। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ পড়াশুনাকালীন সময়ে তেমন কোন গাইড-লাইন কারো কাছ থেকে কখনো পাইনি। বড়ভাইদের কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করলে তারা সঠিক পথের সন্ধান না দিয়ে, ভুগোল বুঝানোর চেষ্টা করত। এর কিছু কারনও আছে, সম্ভবত প্রতিদ্বন্দী তৈরী হওয়ার আশঙ্কাতেই হয়ত সিনিয়ররা এমন করে থাকে! তবে সততার সাথে বলতে পারি, আমি এমনটা নই। আমার ভাবনাটা একটু ভিন্ন, আমি চিন্তা করি যার যোগ্যতা আছে সে উপরে উঠে আসবেই। সহায়তা পেলে হয়ত একটু দ্রুত পারবে, আর সহায়তা না পেলে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে।

বলে রাখা ভাল, চাকুরী করার ইচ্ছা না থাকলেও, পড়াশুনা শেষ করার সাথে সাথে নেটওয়ার্কিং বেইজ একটা চাকুরীর অফার পেয়ে উপায়হীন হয়ে তাতেই যোগ দিলাম। এবং চাকুরী করতে লাগলাম। কিন্তু মনের ইচ্ছা কখনো মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনি।

মূল উৎস থেকে ডাটাএন্ট্রির কাজ পাওয়ার ও করার একটা মানষিকতা মনের ভিতর ছিল ছাত্রজীবন থেকে। কোথায় পাওয়া যায় ডাটাএন্ট্রির কাজ এ নিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। ইন্টারনেটে খুুঁজেছি, মানুষের কাছে খুুঁজেছি, সেটা নিয়ে কিছু মজার ঘটনা আছে, সুযোগ হলে অন্য কোন লেখায় সে বিষয়ে লিখব। যাইহোক, এরপর ২০০৮ সালে একদিন অফিস শেষ করে বাসায় যাওয়ার সময়, রাস্তার পাশে পত্রিকার দোকানে কম্পিউটার ম্যাগাজিনে “ফ্রিল্যান্সিং” একটা শব্দ দেখে থমকে দাড়ালাম। সত্যি বলতে ইংরেজি “ফ্রিল্যান্সিং” শব্দের বাংলা অর্থ তখনও জানতাম না। “ফ্রিল্যান্সিং” কি সেটাও বুঝতাম না। তারপরও কৌতুহলী হয়ে ম্যাগজিনটি দেখতে লাগলাম, এবং এক ঝলক দেখে ম্যাগজিনটি কিনে ফেললাম। বাসায় গিয়ে লেখাটি পড়লাম, দেখলাম প্রবন্ধটির শুরুতে লেখা আছে এর পূর্বের সংখ্যায় ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে আরও কিছু লেখা আছে। তাই খুঁজে খুঁজে পূর্বের সংখ্যাটিও কিনলাম, সেখানে দেখি লেখা আছে এর পূর্বের সংখ্যায়ও আরও কিছু লেখা আছে, তখন সেটিও খুঁজলাম ও কিনলাম। এরপর থেকে প্রতিমাসে ৪টি কম্পিউটার বিষয়ক ম্যাগাজিন নিয়মিত রাখতাম এবং পড়তাম। এভাবেই সব ম্যাগাজিনে ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে লেখা পেলেই পড়তাম এবং সেখান থেকেই ধারণা নিতাম।

এরপর দেখতে দেখতে দিন কেটে যেতে থাকল, কিন্তু অফিসের কাজের প্রচন্ড চাপে ও সময়ের অভাবে ফ্রিল্যান্সিং’টা শুরুই করতে পারছিলাম না। কিন্তু ২০১০ সালের ডিসেম্বরে অফিস পলিটিক্স এর শিকার হলাম, হঠাৎই একদিন ঢাকা থেকে আমাকে ট্রান্সফার করে ১ দিনের নোটিশে একটি বিভাগীয় শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কর্মজীবনে প্রচন্ড এক ধাক্কা খেয়ে মনে হলো আমার জীবনে এটা কি দূর্ভোগ এসে গেলো! কিন্তু মনকে শক্ত রেখে চিন্তা করেছি, চাকুরীটা ধরে রাখি এবং আপ্রাণ চেষ্টা করি নিজে নিজে কিছু করার। দেখলাম, আল্লাহর অশেষ কৃপায় এখানে কাজের চাপ ঢাকা থেকে অনেক কম। কিন্তু অফিসে ইন্টারনেট সংযোগ নেই, তাই ২০১১ সালের জানুয়ারীর ৪ তারিখ নিজের উদ্যোগে বাসায় ইন্টারনেট নিলাম।
ঐদিন থেকেই অফিস সময় বাদ দিয়ে বাকিটা সময় বিশেষ করে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৩টা ৪টা পর্যন্ত জেগে থেকে oDesk নিয়ে পড়ে থাকতাম। oDesk-এ একাউন্ট তৈরী, প্রোফাইল তৈরী, স্কিল টেষ্ট দেওয়া, ভাল কাজের সার্কুলার খোঁজ করা, কাজের জন্য আবেদন করা, সব মিলিয়ে একটা নেশার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল আমার ভিতর। এভাবে টানা ৪টা মাস কেটে গেলো। কোন কাজের রেসপন্স পাচ্ছিলাম না, তারপরও হতাশ না হয়ে লক্ষ্য ঠিক রেখে চালিয়ে যেতে থাকলাম। একটাই লক্ষ্য, আমার চাকুরীর বিকল্প হবে ফ্রিল্যান্সিং। এর ভিতরই দেখলাম সারাদেশে ক্লিক পার্টিদের দৌরাত্ন চলছে প্রবলভাবে। একটার পর একটা ক্লিক পার্টিদের লোভনীয় অফার আর টানাটানি চলছে। কিন্তু এরপরও আমি আমার লক্ষ্য থেকে একচুলও সরে যাওয়ার চিন্তাও কখনো করিনি। এভাবে চলতে চলতে হঠাৎই ২০১১ সালের ১৫ এপ্রিল রাত ৪টার সময়, $০.২৫ (২৫ সেন্ট প্রতি ঘন্টায়) এর একটি ডাটাএন্ট্রির কাজ পেয়ে গেলাম। সাথে সাথে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়লাম। সেই কাজ কয়েকদিন ধরে বুঝে বুঝে করতে লাগলাম, এই কাজ শেষ না হতেই এর মধ্যে আল্লাহর রহমতে আরও কয়েকটি কাজ পেয়ে গেলাম, যার পেমেন্ট ছিল ঘন্টায় $০.৩০ (৩০ সেন্ট)।
সে সময় ঘন্টায় ২৫ সেন্ট, বাংলায় যার পরিমান মাত্র ১৯ থেকে ২০ টাকা। পেমেন্ট হিসেবে যা প্রথম পর্যায়ে খুবই কম হলেও আমি কোনভাবেই হতাশ হইনি বা হাল ছাড়িনি। লক্ষ্য ছিল একটাই, এই স্বল্প পেমেন্টকে ধীরে ধীরে ভাল অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। সেজন্য ধৈর্য্য ধরে কাজ করে গিয়েছি এবং এখন আমি ঘন্টায় ৩ থেকে ৪ ডলার নিয়মিত পেমেন্ট পাই। কখনো কখনো এই পেমেন্ট ৫ ডলারেও পৌছায়। এভেবে স্ট্রাগল করে ও ধৈর্য্য ধরে আমি আমার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি এবং এখনও করছি।

এখানে একটি বিষয় খেয়াল করুন, ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে জানতে শুরু করেছিলাম ২০০৮ সালে। একাউন্ট তৈরী করে আবেদন করতে শুরু করেছিলাম ২০১১ সালের জানুয়ারীর ৪ তারিখ থেকে। আর প্রথম কাজ পেয়েছিলাম ২০১১ সালের এপ্রিলের ১৫ তারিখ। কতটা ধৈর্য্য ধারণ করতে পারলে এত দীর্ঘ সময় একটা বিষয়ের উপর মনোযোগ দেওয়া সম্ভব। আরও একটি বিষয় সবাইকে জানানো প্রয়োজন, আমি কোন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বা কোন ব্যাক্তির কাছে গিয়েও ফ্রিল্যান্সিং শিখিনি বা সাহায্যও পাইনি। বিভিন্ন কম্পিউটার ম্যাগাজিন ঘেঁটে ও অনলাইন থেকে খুঁজে খুঁজে নিয়ম-কানুন শিখেছি। কোন প্রশ্ন সামনে আসলে বা কোন কাজ শেখার জন্য শিক্ষক ভেবেছি এবং বন্ধু হিসেবে সব সময় পাশে পেয়েছি গুগল ও ইউটিউব’কে। যা জানতে চেয়েছি, যা শিখতে চেয়েছি গুগল ও ইউটিউবে গিয়ে সঠিকভাবে সার্চ করে তাইই পেয়েছি। এটি একটি টেকনিক, এটা কারো শিখিয়ে দেওয়া উপায় নয়। সত্যিই, গুগল ও ইউটিউবে আপনি উত্তর খুঁজে পাবেন না এমন কোন প্রশ্ন নেই।

ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আমি কি কি কাজ করি?
আমি অফিসিয়াল চাকুরীতে নেটওয়ার্কিং এর কাজ করলেও ফ্রিল্যান্সিং এর জন্য আমি পার্সোনাল এসিষ্টেন্ট হিসেবে কাজ করি, সাথে ওয়েব রিসার্চ, ডাটা এন্ট্রি এর কাজ করি। টুকটাক ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ডিজাইন এর কাজও করছি পার্সোনাল এসিষ্টেন্ট হিসেবে। যেটা শিক্ষানবীশ এর পর্যায়ে পড়ে। আমার এক ক্লায়েন্ট আমাকে তার কাজের প্রয়োজনেই কিছু শিখায় এবং আমাকে দিয়ে অল্প-স্বল্প ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ডিজাইন এর কাজ করায়। চেষ্ট করছি ধীরে ধীরে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও ডিজাইন এর কাজ শিখে নেওয়ার। আশা আছে ভবিষ্যতে এর মধ্যমে আরও ভাল পেমেন্ট পাব।

কিছু অতি জ্ঞানী ফ্রিল্যান্সার কিংবা প্রোগ্রামার টাইপের ফ্রিল্যান্সার’রা, বিশেষ করে ওয়েব ডিজাইনার বা ডেভলপার’রা বলেন, ওয়েব রিসার্চ ও ডাটা এন্ট্রির মতো এই কাজগুলো কোন কাজই নয়। তাদের এটা বোঝা উচিৎ যাদের ঐ ধরনে যোগ্যতা নেই তারা কি করতে পারে!

যেহেতু আমার প্রোগ্রামিং বা ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট এর মতো কোন কাজ জানা ছিলনা তাই আমি চেষ্টা করতে থাকলাম ইংরেজিতে আরও একটু দক্ষতা বৃদ্ধি করার এবং কিছু ওয়েব বেইজ কাজ একটু ভাল করে আয়ত্ব করার। ওয়েব রিসার্চ ও ডাটা এন্ট্রির মতো কাজগুলো অপেক্ষাকৃত সহজ, তাই এগুলোই করার জন্য মনস্থির করলাম। এ কারনে ওয়েব রিসার্চ ও ডাটা এন্ট্রির মতো কাজগুলো করতে কিছু ওয়েব বেইজ কাজও শিখেছি গুগল ও ইউটিউব এর সাহায্য নিয়ে যেমনঃ
১) গুগলে কিভাবে সঠিক ভাবে সার্চ করে সঠিক তথ্য বের করে নিয়ে আসতে হয়।
২) বিশ্বের বিখ্যাত বিভিন্ন ডিরেক্টরি থেকে কিভাবে সঠিক তথ্য বের করা যায়।
৩) গুগলে ও বিভিন্ন ডিরেক্টরিতে সার্চ করে বিভিন্ন ব্যাক্তির যোগাযোগের তথ্য কিভাবে বের করতে হয়।
৪) ওয়ার্ডপ্রেস, ম্যাজেন্টো, ভলিউশন, জুমলা সিএমএস দ্বারা তৈরী করা কোন ওয়েবসাইটে কিভাবে আর্টিকেল পোষ্টিং দিতে হয় ও পণ্য লিষ্টিং করতে হয়।
৫) ebay, alibaba ও amazone এর মতো বিখ্যাত B2B সাইটগুলোতে কিভাবে পন্য লিষ্টিং করতে হয়।
৬) এছাড়া Microsoft Word, Microsoft Excel, Google Spreadsheet এর ব্যবহার ও এর কাজ তো আগেই জানতাম।

নতুনদের জন্য পরামর্শঃ
ফ্রিল্যান্সিং করতে চাইলে আপনাকে ডিটারমাইন হতে হবে, অর্থাৎ আপানাকে লক্ষ নির্ধারণ করতে হবে যে আপনি ফ্রিল্যান্সিং এ ক্যারিয়ার গড়তে চান। যদি এমন ভাবেন যে, “দেখি একটু ট্রাই করে কি হয়!” তবে আমি বলব এমন করে সময় নষ্ট করার কোন দরকার নেই। আমার ফ্রিল্যান্সিং এ আগমনের ও এগিয়ে যাওয়ার যে ঘটনা আমি আপনাদের জানালাম, যদি এমন স্ট্রাগল করার মন-মানষিকতা থাকে, যদি এমন ধৈর্য্য ধরে শিখতে ও কাজ করতে পারেন তবে শুরু করুন, অন্যথায় নয়। ফ্রিল্যান্সিং এর সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো ধৈর্য্য ধরতে পারা ও নিজের মধ্যে শেখার আগ্রহ থাকা। এটা যদি থাকে তবে এগোতে পারেন, নইলে কেটে পড়ুন।

ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে কারো কিছু জানার থাকলে বা যে কোন প্রয়োজনে মন্তব্য করতে পারেন, জানা থাকলে অবশ্যই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। যারা এগোতে চান তাদের জন্য শুভ কামনা রইল। আর আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন আরও ভাল কাজ করতে পারি। ধন্যবাদ সবাইকে।

আপনাদের প্রয়োজনে আমার অন্যান্য সোস্যাল মিডিয়া প্রোফাইলগুলোকে ফলো করতে পারেন। কোন আপডেট থাকলে এগুলো থেকেই পেয়ে যাবেনঃ
Facebook | Youtube Channel | Twitter | LinkedIn | Google Plus

আমার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটঃ wadudofficial.com

ফেসবুক আইডি থেকে মন্তব্য করতে পারেন

টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনি চাইলে এই এইচটিএমএল ট্যাগগুলোও ব্যবহার করতে পারেন: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>